সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের বিশেষ মনোযোগ থাকলেও কোনো এক অদ্ভুত কারণে নিজের স্তনের স্বাস্থ্যের প্রতি বেশীরভাগ নারীরই তেমন উৎসাহ দেখা যায় না। অথচ শরীরের আর দশটি অঙ্গের মতো স্তনের যত্ন নেওয়াটাও জরুরী। বিশেষ করে ৩০ বছর বয়সের পর আমাদের জীবনযাত্রা এবং স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের কারণে স্তনের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাটাও হয়ে পড়ে জরুরী। জেনে নিন স্তনের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবশ্য করণীয় কিছু কাজ।
১. ব্যবহার করুন সঠিক মাপের ব্রা: আরামদায়ক এবং স্বাস্থ্যকর ব্রা ব্যবহার করুন এবং অবশ্যই সঠিক মাপের ব্রা ব্যবহার করুন। সময়ের সাথে ব্রা সাইজ চেঞ্জ হতে পারে এ কারণে এক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরী।
২. মাঝে মাঝে ব্রা ছাড়াই থাকুন: বাড়িতে ব্রা ছাড়াই থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার শরীর অনেকটা শান্তি পাবে। মাঝে মাঝে স্পোর্টস ব্রা পরেও থাকতে পারেন।
৩. মাসাজ করুন: শুধু হাত-পা নয়, রক্ত চলাচল বজায় রাখতে মাঝে মাঝে স্তন মাসাজ করতে পারেন।
৪. নিজে থেকেই পরীক্ষা করুন: নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করলে ক্ষতি কোথায়? কোনো রোগ আপনার স্তনে বাসা বেঁধেছে কিনা তা জানতে মাঝে মাঝে স্তন পরীক্ষা করুন নিজেই। স্তনে কোনো রকম পরিবর্তন দেখতে পেলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
৫. স্বাস্থ্যকর খাবার খান: মধ্যবয়সে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়। এ সময় থেকেই বেশি করে ফলমূল এবং শাকসবজি খাওয়া উচিৎ। এতে সারা শরীরের পাশাপাশি আপনার স্তন থাকবে সুস্থ।
৬. ময়েশ্চারাইজিং: সারা শরীরের ত্বকের মতো স্তনের ত্বকেও পড়তে পারে বয়সের ছাপ, বলিরেখা এবং কুঞ্চন। এ কারণে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করাটা জরুরী।
৭. ধূমপান নিষিদ্ধ: খুব কম সময়েই আমাদের বয়স বাড়িয়ে দিতে পারে ধূমপান। এর পাশাপাশি স্তন ঝুলে যাবার কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে ধূমপান। সুতরাং নিজের শরীর ভালো রাখতেই বাদ দিন এই বিশ্রী অভ্যাসটি। কমিয়ে ফেলুন ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রাও।
৮. ব্যায়াম করুন: বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরকে ফিট রাখতে করুন ব্যায়াম। স্তনের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য করতে পারেন এই ব্যায়ামগুলো। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে কমে যাবে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি।
৯. ম্যামোগ্রাম: একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর স্তন সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডাক্তারের সাথে কথা বলে বার্ষিক স্তন পরীক্ষা বা ম্যামোগ্রাম করান যাতে কোনো রোগ থাকলে তা শনাক্ত করা যায় দ্রুত। তবে পারিবারিক ইতিহাস না থাকলে ম্যামোগ্রাম না করিয়ে সাধারণ ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে পারেন।
১০. থাকুন ইমপ্ল্যান্ট এবং কেমিক্যাল থেকে দূরে: ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট এবং এনহান্সিং কেমিক্যালগুলো আপনার সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্যই ভীষণ ঝুকিপুর্ণ। এগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন।
১১. ব্রেস্ট ফিডিং করান: আপনি মা হয়ে থাকলে অবশ্যই বাচ্চাকে সঠিক উপায়ে ব্রেস্ট ফিডিং করান। তা আপনার স্তনের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।
১২. ঝুঁকির ব্যাপারে জেনে রাখুন: আপনার পারিবারিক ইতিহাসে কারও ব্রেস্ট ক্যান্সার আছে কিনা তা জানা থাকলে নিজের ঝুঁকির ব্যাপারেও আপনি সতর্ক থাকতে পারবেন।
১৩. স্তন সম্পর্কে সচেতনতা: কখনও যদি অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন স্তনে দেখতে পান যেমন চাকা অনুভব করা, কোন বিশেষ অংশ কুঁচকে যাওয়া। রক্ত অথবা পুঁজ বের হলে দেরি না করে অতিসত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
১৪. ঘরের কাজ করুন: স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াতে আরাম আয়েশে সময় নষ্ট না করে ঘরের কাজে নিজেকে নিযুক্ত করার চেষ্টা করুন। একজন নারীকে প্রতিদিন ২৫ মিনিট করে ঘরের কাজে হাত লাগাতে হবে, এতে ২০% -৩০% স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। কর্মজীবী নারীরা ঘরের ছোটখাটো কাজগুলো নিজেই সেরে নিন।
১৫. কোলেস্টেরল কমানো: স্বাস্থ্যের জন্য অধিক পরিমাণ কোলেস্টেরল গ্রহণ স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বয়ে আনবে। কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন। কোলেস্টেরল শরীরে টিউমার গঠনে সহায়তা করে। সবুজ শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার যেমন -রঙিন ফলমূল, সয়ামিল্ক, ছোটমাছসহ বিভিন্নধরনের সামুদ্রিক মাছ গ্রহণ করুন।
১৬. শিশুকে বুকের দুধ পান করান: যারা নতুন মা হয়েছেন তাদের মনে রাখতে হবে কমপক্ষে ছয়মাস পর্যন্ত বুকের দুধ পান করাতে হবে। অনেকে বাজার থেকে কিনে আনা দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ান যা শিশুর শারীরিক বিকাশ না হওয়ার পাশাপাশি মায়ের স্তন কান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
১৭. নিয়মিত ব্যায়াম করুন: সকালে ঘুম থেকে উঠে বা বিকালে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। পার্কে বা রাস্তায় একটু হাঁটা বা জগিং শরীরের অতিরিক্ত চর্বি নিঃসরণে সহায়তা করে। অতিরিক্ত মেদ যেহেতু কান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, সেহেতু প্রতিদিন ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
১৮. অস্বাস্থ্যকর কেমিক্যাল ব্যবহার ত্যাগ করুন: খাবার তৈরির সময় কৃত্রিম রং ব্যবহার করা যাবে না। বাইরের খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন যাতে কৃত্রিম রং না থাকে। এছাড়া ওভেনে খাবার গরম করার ক্ষেত্রে প্ল্যাস্টিক কন্টেইনার ব্যবহার পরিহার করুন। ব্যথানাশক ওষুধ পরিহার করুন।
যে খাবার রুখে দেবে স্তন ক্যান্সার
নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার আপনাকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে। আর প্রতিদিন বিশেষ কিছু খাবার আপনাকে দূরে রাখতে পারে স্তন ক্যান্সার থেকে যা বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত ভাবনার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কিছু খাবার যা খুব বেশি দামী নয় আর পাওয়া যায় হাতের কাছেই এবং যা রুখে দিতে পারে আপনার স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি। জেনে নিন এ ধরনের ৭ টি খাবার সম্পর্কেঃ
বাঁধাকপি: বাঁধাকপিতে থাকে প্ল্যান্ট কম্পাউন্ড যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। সালাদ বা কোলস্লো বানিয়ে খেতে পারেন বাঁধাকপি। কাঁচা খেতে ভালো না লাগলে হালকা ভাপিয়ে নিতে পারেন সামান্য লবন দিয়ে। বাঁধাকপি কখনোই বেশি সময় ধরে রান্না করবেন না। হাল্কা সবুজ আভা থাকতে থাকতেই চুলা থেকে নামিয়ে নিন। নয়তো এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় অনেকটাই।
অলিভ অয়েল: অলিভ অয়েলে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা মূল জায়গা থেকে দেহের নানা ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। এটি স্তনে টিউমারের বৃদ্ধি রোধ করে ও স্তন ক্যান্সার ঠেকায়। মাংস ম্যারিনেট করে রাখার সময় আপনি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন খানিকটা অলিভ অয়েল আর সেই সাথে সবজি রান্নাতেও খানিকটা দিতে পারেন।সবচেয়ে ভালো হয় যদি সালাদের ড্রেসিং এ ব্যবহার করতে পারেন।
উজ্জ্বল রঙের ফল ও সবজি: উজ্জ্বল রঙের বিশেষত লাল, হলুদ ও কমলা রঙের সবজি ও ফলে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ছাড়াও থাকে ক্যারোটিনয়েড নামক পদার্থ। যা স্তন ক্যান্সার প্রতিহত করে। তরমুজ, কমলা, লাল মরিচ, মিষ্টি আলু, টমেটো, গাজর ইত্যাদি বেশি করে খাদ্য তালিকায় রাখুন।
সবুজ শাক: সবুজ শাকে থাকে ভিটামিন বি যা আপনার ডি এন এ কে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে আর প্রতিরোধ করে স্তন ক্যান্সার।যদি আপনার শাক রান্না খেতে ভালো না লাগে, তবে শাক কুচি করে মেশাতে পারেন পাস্তা, নুডলস, সালাদ বা সসের সাথে।
কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার: কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারে থাকে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি স্তন ক্যান্সার থেকে আপনাকে দূরে রাখে। টকদই ও পনির খেতে পারেন। এগুলো আপনাকে মোটা হতে না দিয়েই স্বাস্থ্যের সুরক্ষা করবে।
আখরোট: আখরোটে যদিও প্রচুর ক্যালোরি থাকে তবু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এটি স্তনের টিউমারের বৃদ্ধির গতি কমিয়ে আনে। কম করে হলেও আখরোট খান যা আপনার স্তনকে রাখবে ক্যান্সার থেকে সুরক্ষিত।
সামুদ্রিক মাছ: সামুদ্রিক মাছে আছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা প্রদাহ প্রতিরোধ করে একে ক্যান্সারে রূপ নিতে বাধা দেয়। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন সামুদ্রিক মাছ খান যা আপনাকে স্তন ক্যান্সার থেকে দূরে রাখবে শত হাত।
ডালিম: স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে ডালিম বিশেষভাবে সহায়তা করে। এতে আছে পলিফেনল নামক এলাজিক অ্যাসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান যা ক্যান্সারের বৃদ্ধি প্রতিরোধে সাহায্য করে। এই মজার ফল প্রতিদিনের খাবার তালিকায় যোগ করে কার্যকর স্বাস্থ্য উপকারিতা লাভ করা সম্ভব।
তিসি: স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী ক্যান্সারের কোষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকার ভূমিকা পালন করে তিসিতে থাকা ওমেগা-থ্রি, লিগনান্স এবং আঁশ।
তিসির বীজ, আস্ত তিসি বা তিসির তেল খাবারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। স্মুদিতে তিসি যোগ করে অথবা তিসির তেল সালাদে ড্রেসিং করার কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও খাবার বেইক করতে যেমন বিস্কুট বা মাফিন তৈরি করতে তিসি ব্যবহার করা যায়।
রসুন: ক্যান্সার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপাদান ‘অ্যালিয়াম’ উচ্চ মাত্রায় থাকে এই মসলায়। রসুন ছাড়াও এই ধরনের অন্যান্য মসলা যেমন- পেঁয়াজ, পেঁয়াজজাতীয় গাছেও এই উপাদান পাওয়া যায়।
এগুলো টিউমারের বৃদ্ধি রোধ ও কোলোরেক্টাল ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন সকালে একটি রসুন ছেঁচে বা গিলে খেলে তা সারাজীবনের জন্য ক্যান্সার থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে।
বর্তমানে ডাক্তাররা পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমেই বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের কথা বলছেন। এগুলোর মধ্যে স্তন ক্যান্সার অন্যতম। পুষ্টিকর খাবার খান আর প্রতিরোধ করুন স্তন ক্যান্সার। [১]
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কাদের বেশি
বয়স বাড়তে থাকলে নারীর স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আরো অনেক কারণ রয়েছে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি হওয়ার। তবে সংকোচ না করে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিলে মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। এ বিষয়ে কথা বলেছেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের, ক্যানসার ইপিডিমিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।
প্রশ্ন : স্তন ক্যানসার কী? কিছু কারণ স্তন ক্যানসারের জন্য দায়ী। সেগুলো কী?
উত্তর : শরীরের অন্যান্য জায়গার মতো স্তনেও টিউমার হয়। টিউমার তো দুই ধরনের হয়। একটি হলো বিনাইন টিউমার, অন্যটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। আমাদের যে কোষ বৃদ্ধি হয়, যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা বড় হই, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে যদি কোনো অস্বাভাবিকতা হয়, অনেক কোষ যদি একসাথে বাড়তে থাকে নিয়ম ছাড়া- এ রকম অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির কারণে যে চাকা বা পিণ্ড হয় একে বলি টিউমার। এটা অন্য জায়গার মতো স্তনেও হতে পারে। এই টিউমার দুই রকম। টিউমার যে অঙ্গে বা যে টিস্যুতে (অনেকগুলো কোষের সমন্বয়ে বলি টিস্যু) হয়, যদি টিস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অন্য কোথাও না ছড়ায় একে বলি বিনাইনি টিউমার। অর্থাৎ এটা ক্ষতিকর নয়। কারণ এটি অন্য কোথায়ও ছড়ায় না। আক্রান্ত করে না।এটা অস্ত্রোপচার করে ফেলে দিলেই চিকিৎসা করা হয়ে যায়।
আরেকটি হলো ম্যালিগনেন্ট টিউমার, যেটা নিয়ে আমাদের মূল মাথা ব্যথা। সেটা হলো, এই টিউমার বড় বা ছোটো হতে পারে। তবে এর প্রকৃতিটা হলো সে এক জায়গায় চুপচাপ থাকবে না। এটি আশপাশের গঠনগুলোকে ধরবে, শরীরে যে লসিকা নালি রয়েছে এর মাধ্যমে আশপাশের গ্রন্থি এবং লসিকা গ্রন্থিকে আক্রান্ত করে। এমনকি রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে শরীরের দূরের কোনো অঙ্গের ওপর আঘাত করতে পারে। এটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে যায়। এটিও হলো ম্যালিগনেন্ট টিউমারের বৈশিষ্ট্য। আর সহজে বোঝার জন্য শরীরের যেকোনো ম্যালিগনেন্ট টিউমারকে আমরা বলি ক্যানসার। স্তনেরটাও একই রকম।
স্তনের মধ্যে যে টিউমার হয় বা ক্যানসার হয় সেটিতো নয়, ছোটোখাটো আরো অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে। ফোড়া হতে পারে, ত্বকে সমস্যা হতে পারে, নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।
আরেকটি হয় টিউমারের ভেতরটি ভরাট থাকে। ভেতরটি একদম ভরাট। কোনো ফাঁকা নেই। তবে এক ধরনের বিষয় হয়, সিস্ট বলি আমরা, একটি বস্তা বা থলের মতো। এর মধ্যে পানি জমতে পারে, পুঁজ জমতে পারে। এটাকে আমরা সিস্ট বলি। স্তনে এ রকম সিস্টও হতে পারে।
স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে জীবন যাপনে কিছু পরিবর্তন আনলে ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায়। ঝুঁকির কারণ আমরা বলি, খুব মুটিয়ে যাওয়া। এটি কীভাবে হয়? যাদের খাওয়া দাওয়ার রুচি খুব বেশি, মাংস ও লাল মাংস, চর্বি জাতীয় মাংস বেশি খায়, তবে পরিশ্রম করে না, কাজ করে না, ব্যায়াম করে না তাদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। এটি স্তন ক্যানসারের একটি ঝুঁকির কারণ।
খুব অল্প বয়সে বিয়ে হলে যেমন জরায়ুমুখের ক্যানসার বাড়ে। আবার খুব বেশি বয়সে বিয়ে বা প্রথম বাচ্চা যদি ৩০ থেকে ৩২ বছরের পরে নেয় তাহলে স্তন ক্যান্সারে ঝুঁকি বাড়ে। বিয়ের বয়স একটি ঝুঁকির কারণ। সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে। আগেও নয়, পরেও নয়।
আর সবচেয়ে বেশি জোড় দিতে চাই স্তনপান করানোর ওপর। একজন মা তাঁর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াবেন, এটা স্বাভাবিক। যাঁরা সন্তানকে স্তন পান করান না তাঁরা দুই ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন। প্রথমত নিজের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেন। আর দ্বিতীয়ত শিশুর যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেটা মায়ের দুধের মধ্য থেকে আসে সেটি কমিয়ে দেন। এই জন্য আমরা বলি কিছু জিনিস চাইলেই আমরা পরিবর্তন করতে পারি।
আর কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। এগুলো আসলে অপরিবর্তনযোগ্য। এর মধ্যে এক নম্বর হলো বয়স। আর কোনো ঝুঁকির কারণের দরকার নেই। কেবল বয়স বাড়তে থাকবে একজন মহিলার স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে থাকবে। পশ্চিমা বিশ্বে বলা হয়, পঞ্চাশের বেশি বয়সে ঝুঁকি বেশি। তবে আমরা অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ৪০ বছরের পর থেকেই রোগী আসতে থাকে। পরিবেশগত কারণেও এটি হতে পারে।
এ ছাড়া কারো পরিবারে যদি মা,খালা নানি, বড় বোন এ রকম কারো স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থাকে তাহলে ঝুঁকি বেশি থাকে।
আরো কিছু বিষয় রয়েছে, খুব অল্প বয়সে যাদের মাসিক হয়ে যায় এবং দেরিতে বন্ধ হয়। ইসট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের সাথে যেহেতু স্তন ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে, যত বেশি লম্বা সময় ধরে কেউ এই হরমোনের সংস্পর্শে থাকবে, ততো বেশি ঝুঁকি হবে। আরেকটি হলো মাসিক দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হতে পারে। অথবা কারো অস্ত্রোপচারের পর যদি ইউটেরাস ফেলে দেওয়া হয় তখন অনেকের অনেক ধরনের সমস্যা হয়। এ সময় কখনো কখনো চিকিৎসক রিপ্লেসমেন্ট হরমোন থেরাপি দেন। এটা দীর্ঘদিন নিলে তাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
প্রশ্ন : রোগ নির্ণয় কীভাবে করা হবে?
উত্তর : আমরা যে বলি প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় এটারও দুটো ধাপ রয়েছে। একটি ধাপ হলো যখন স্তন ক্যানসারের কোনো লক্ষণ ফুঁটে উঠেছে। যেমন লক্ষণগুলো কী? একটি চাকা বা পিণ্ড যদি হয়, আরেকটি হলো চামড়ার মধ্যে যদি কুচকানো হয়, স্তনের বোটা যদি ভেতরে ঢুকে গিয়ে থাকে অথবা সেখান থেকে যদি রক্ত বা রক্ত মিশ্রিত পানি বের হয়। এ ধরনের যদি লক্ষণ থাকে তাহলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
উন্নত বিশ্বে রোগটি নির্ণয়ের জন্য ম্যামোগ্রাম করা হয়। ম্যামোগ্রাম এমন ধরনের এক্সরে যেটা করলে স্তনের ভেতর কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন হলে সেটা ধরা পড়ে। তবে আমাদের দেশে তো এটি গ্রামেগঞ্জে বা জেলা পর্যায়ে নেই।
আরেকটি হলো ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন। একজন চিকিৎসককে দিয়ে স্তন পরীক্ষা করা। আর সর্বশেষ হলো নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা। একজন মহিলা যদি প্রতি মাসে নিজের স্তন পরীক্ষা করেন তখন করতে করতে একটা সময় ঠিকই টের পাবেন। কীভাবে করবে সেটি? মাসিক শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে একটি তারিখ ঠিক করে নিতে হবে। প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট সময় ওই নারী স্তন পরীক্ষা করে দেখবেন। প্রথমে দেখবেন চামড়ার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আছে কি না। ডান হাত দিয়ে বাম স্তন এবং বাম হাত দিয়ে ডান স্তন অনুভব করতে হবে। স্তন পরীক্ষার সাথে সাথে অবশ্যই তাঁর বগলতলা পরীক্ষা করবেন। কারণ আমরা জানি স্তনের ক্যানসার হলে সর্বপ্রথম বগলতলা আক্রান্ত হয়। এইভাবে একজন মহিলা যদি প্রতি মাসে একবার পরীক্ষা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন।
অবশ্যই হাতের মাঝের তিন আঙ্গুল ব্যবহার করতে হবে। ঘড়ির কাটার মতো চার দিকে হালকা চাপ দিতে হবে। এরপর মাঝখানে চাপ দিতে হবে। এতে যদি মার্বেল বা সুপারির মতো কিছু টের পাই তাহলে বুঝব এটা টিউমার হতে পারে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই আপনি আপনার কাছে যে চিকিৎসক রয়েছেন তাঁর কাছে যাবেন।
প্রশ্ন : একটু জানতে চাইব আতঙ্কহগ্রস্ত হওয়ার আগে, আমাদের দেশের নারীদের সবচেয়ে বেশি যেই বিষয়টি প্রভাবিত করে লজ্জাবোধ সামাজিকভাবে। এমনও অনেকে রয়েছেন স্বামীর সাথে কথা এ বিষয়ে কথা বলতেও লজ্জাবোধ করেন। তাঁদের জন্য কী পরামর্শ?
উত্তর : তাদের জন্য একটি কথাই বলব, যেহেতু রোগটি চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তাই চিকিৎসা করাতে হবে। এটি এমন একটি রোগ যেটা চিকিৎসা করলে সুস্থ হওয়া সম্ভব, আবার চিকিৎসকের কাছে না গেলে প্রাণঘাতী হিসেবে ধরি। সেই রোগের জন্য সংকোচ করব না। টের পেলে স্বামী বা সন্তানদের বলব। আর চিকিৎসকের কথা যখন আসবে তখন নারী চিকিৎসক যদি হাতের কাছে থাকেন তাঁর কাছে যাবেন তবে এর মানে এই নয় যে আপনি পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাবেন না। কারণ জীবন বাঁচানো ফরজ। যত দেরি করবেন ততই ঝুঁকির দিকে রোগটি চলে যাবে।
[১] অনলাইন ডেস্ক [২] ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ক্যানসার ইপিডিমিওলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের।
No comments:
Post a Comment