গানে-কথনে একুশের চেতনা - অজানা ১০১
,

ব্রেকিং

Post Top Ad

PropellerAdsPropellerAds

Sunday, February 22, 2026

গানে-কথনে একুশের চেতনা


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রতিবছরই সংগীত, আবৃত্তি ও কথনে একুশের চেতনাকে ধারণ করে আয়োজন করে ছায়ানট। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শনিবার সকালে ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এক অনাড়ম্বর কিন্তু সুশৃঙ্খল নিবেদন।

ছিমছাম গোছানো পরিবেশনায় মিলনায়তনজুড়ে ছিল সংযত সৌন্দর্য। শিল্পীদের পরনে সাদাকালো শাড়ি ও পাঞ্জাবি—রঙের এই সংযম যেন ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি নীরব শ্রদ্ধা। ফুলের বাড়তি সাজসজ্জা নয়, অল্প আলো আর কণ্ঠের মাধুর্যেই গড়ে উঠেছিল ‘ভাষাশহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ছায়ানটের নিবেদন’ আয়োজন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছায়ানটের সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘আমাদের চেতনার সৈকতে’। নজিম মাহমুদের রচনায় এই গান একুশের বোধকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানায়; যার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন দর্শকেরা।

এরপর কথন পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী। ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নামে যে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক আমরা, তার জন্মকথার প্রথম অধ্যায়টি রচনা করেছিলেন ১৯৪৮ থেকে ৫২; ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও শহীদরা। আজ (গতকাল) ছায়ানট একুশকে উদ্‌যাপন করছে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে। একটি দেশের মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন খুব মৌলিক বিষয়গুলো স্মরণে আনতে হয়। আজ ২০২৬-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে এমন এক সময় সম্ভবত এসেছে।’

কথন পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী

সারওয়ার আলী আরও বলেন, ‘একটি জাতির পরিচয় তার ভাষা। তার জীবনযাত্রার প্রকাশ ঘটে তার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। যে সংস্কৃতি সাধনায় রত ছায়ানট।’ তাঁর ভাষ্যে, ‘বাঙালির সৌভাগ্য, এমন একটি সমৃদ্ধ ভাষায় সে বসবাস করে, তার ভাব প্রকাশ করে, যার ঐতিহ্য তাকে মহিমান্বিত করেছে।’

পরে ছিল একক গান ও আবৃত্তি। সুস্মিতা দেবনাথ গাইলেন অতুলপ্রসাদ সেনের ‘মোদের গরব মোদের আশা’। ইফ্‌ফাত বিনতে নাজির পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’। ধ্রুব সরকারের কণ্ঠে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ মিলনায়তনে সৃষ্টি করে আবেগঘন মুহূর্ত; ফজল–এ–খোদার গানের কথায় ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একক পরিবেশনা

ডালিয়া আহমেদের একক আবৃত্তি ‘মাতৃভূমির জন্য’-এ উঠে আসে আত্মত্যাগের অনুরণন। প্রিয়ন্তু দেব গাইলেন ‘অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে’—আবু হেনা মোস্তফা কামালের রচনায় প্রতিবাদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যেন আবার জ্বলে ওঠে। ঐশ্বর্য সমদ্দারের ‘ও আমার এই বাংলা ভাষা’ গানে ছিল মমতার সুর, আর মোহিত খানের কণ্ঠে ‘মাগো ধন্য হলো’ যেন মাতৃভাষার প্রতি সন্তানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

নুসরাত জাহান পরিবেশন করেন নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো’, অর্ণব বড়ুয়ার কণ্ঠে শোনা যায় আব্দুল লতিফের ‘মাগো আটই ফাল্গুনের কথা’। ফারজানা আফরিন গাইলেন ‘আমার দেশের মতন এমন’—দেশপ্রেমের আবেগে ভরা গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে অনুরণন তোলে।
একক আবৃত্তি পর্বে দেওয়ান সাঈদুল হাসান আবৃত্তি করেন অসীম সাহার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। শব্দে শব্দে ধ্বনিত হয় ভাষাশহীদদের স্মৃতি। আবৃত্তির পর সুমন মজুমদারের কণ্ঠে ‘ভেবো নাগো মা তোমার ছেলেরা’ গানে ফিরে আসে সংগ্রামের অঙ্গীকার।
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে আবারও সম্মেলক কণ্ঠে ছায়ানট পরিবেশন করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর অমর এই গান মিলনায়তনে উপস্থিত সবাইকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। অনেকের চোখে জল চিকচিক করে, অনেকেই কোরাসে কণ্ঠ মিলিয়ে নেন।
সবশেষে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।

No comments:

Post a Comment