কাছ থেকে দেখা আশা ভোসলে - অজানা ১০১
,

ব্রেকিং

Post Top Ad

PropellerAdsPropellerAds

Wednesday, April 15, 2026

কাছ থেকে দেখা আশা ভোসলে


জনসমক্ষে আশা ভোসলে নিজস্ব এক অনন্য শৈলী গড়ে তুলেছিলেন—রেশমি শাড়ি, কপালে বড় টিপ, আর ঝলমলে গয়নায় সজ্জিত এক দীপ্ত উপস্থিতি। মঞ্চে উঠলেই যেন আলোর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতেন তিনি।

২০১৫ সালের কথা। খবর পেলাম, কিংবদন্তি এই শিল্পী বার্লিনে আসছেন। সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগেনি—যেতেই হবে। বন্ধুরা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিল। টিকিট বলতে মূলত নাম রেজিস্ট্রেশন, কিন্তু আগ্রহ ছিল তার বহু গুণ বেশি। বার্লিনের ‘হাউস ডের কুলটুর ডের ভেল্ট’—বিশ্ব সংস্কৃতি কেন্দ্রের সপ্তাহব্যাপী ‘মাদার ইন্ডিয়া’ শিরোনামের আয়োজনে মধ্যমণি ছিলেন আশা ভোসলে।

আমাদের কৈশোরজুড়ে যে গানগুলো ভেসে বেড়াত—‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায়’ কিংবা বাংলা ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’—সেই সব গান আমাদের এক অন্যরকম উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে রাখত। তাঁর গান শুনে নিজেদের আধুনিক মনে হতো, জীবন যেন একটু অন্য রকম হয়ে উঠত। মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সেই মেয়ে, যিনি পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত বাঙালি সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মনকে বিয়ে করেছিলেন—সেই সূত্রে তিনি বাঙালিরও আপন হয়ে উঠেছিলেন।

একের পর এক গেয়ে গেলেন ‘দম মারো দম’, ‘পর্দে মে রেহনে দো’, আবার কখনো উচ্চাঙ্গসংগীতের রাগভিত্তিক পরিবেশনায় ছুঁয়ে দিলেন ভিন্ন এক জগৎ

১ আগস্ট ২০১৫। রৌদ্রোজ্জ্বল এক বিকেল। পানির ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন মঞ্চে শুরু হলো তাঁর পরিবেশনা। প্রথমেই ‘উমরাও জান’ ছবির বিখ্যাত গজল—‘ইন আখোঁ কি মস্তি’, তারপর ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’। একের পর এক গেয়ে গেলেন ‘দম মারো দম’, ‘পর্দে মে রেহনে দো’, আবার কখনো উচ্চাঙ্গসংগীতের রাগভিত্তিক পরিবেশনায় ছুঁয়ে দিলেন ভিন্ন এক জগৎ।

সেদিনের আসরে আশার গান শুনতে আসা দর্শক

হাজারখানেক দর্শকের ভিড়ে ছিল মাত্র পঞ্চাশের মতো বাঙালি। তাঁদের অনুরোধে তিনি যখন গাইলেন ‘না যেও না, রজনী এখনো বাকি’—সেই মুহূর্ত যেন অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল। মনে হলো, দূরদেশে থেকেও হঠাৎ খুব কাছের হয়ে উঠেছে সেই কণ্ঠ।
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রায় দুই হাজার দর্শককে সম্মোহিত করে রাখলেন তিনি। গানের ফাঁকে ফাঁকে শুনিয়েছেন নিজের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, জীবনের নানা স্মৃতি। মঞ্চে তাঁর সঙ্গে ছিলেন অমিত কুমার—কিংবদন্তি কিশোর কুমারের পুত্র। ছিলেন তাঁর দৌহিত্র লায়লাও।

পরের দিন বার্লিনের ‘টাগেস স্পিগেল’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘৮২ বছর বয়সী বলিউড কিংবদন্তি আশা ভোসলে বার্লিনে এক অসাধারণ কনসার্টে গান পরিবেশন করেন। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন কোনো গান বা কণ্ঠ শুনে মনে হয়—এই তো প্রেম। আর আশা ভোসলের কণ্ঠে প্রেমে না পড়ে থাকা যায়?’

বাঙালি শ্রোতারা;

আসলেই, উপমহাদেশের এই কিংবদন্তিকে কাছ থেকে দেখা জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা। সেই সন্ধ্যার আলো, সেই কণ্ঠের মায়া—সবকিছু আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। তাঁর প্রয়াণের পর বারবার ফিরে আসে সেই রাতের কথা। মনে হয়, ওপারে কোথাও হয়তো এখনো গাইছেন তিনি—চিরকালীন, কালজয়ী আশাজি।

No comments:

Post a Comment