
মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ যখন কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন চিকিৎসকেরা অন্য একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে সেই অঙ্গটি নিয়ে অসুস্থ মানুষের শরীরে বসিয়ে দেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন। একটি সুস্থ কিডনি, লিভার বা হৃৎপিণ্ড একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে সফলভাবে বসানো যায়। বিষয়টি হয়তো তোমাদের মধ্যে অনেকে কিছুটা হলেও জানো।
কিন্তু তোমাদের মনে কি কখনো এমন অদ্ভুত প্রশ্ন এসেছে—একবার প্রতিস্থাপন করা কোনো অঙ্গ কি দ্বিতীয়বার অন্য কারও শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব? অর্থাৎ একজনের কিডনি বা লিভার দ্বিতীয় একজনকে দেওয়ার পর, সেই একই অঙ্গ কি ওই দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীর থেকে বের করে তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া যায়?
সংক্ষেপে উত্তর—হ্যাঁ, যায়! তবে কাজটা মোটেও সহজ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। সাধারণত কোনো অঙ্গ একবার প্রতিস্থাপন করার পর সেটি দ্বিতীয়বার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এই অসম্ভবকেও সম্ভব করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০১২ সালের একটি ঘটনা শুনলে তুমি রীতিমতো অবাক হবে। ২৭ বছর বয়সী এক তরুণের কিডনি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে একটি সুস্থ কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ঠিক দুই সপ্তাহ পর।
ওই তরুণের শরীরে অত্যন্ত জটিল একটি রোগ ছিল, যা কিডনির ভেতরের অতি সূক্ষ্ম ছাঁকনিগুলোকে আক্রমণ করত। এই রোগের কারণে নতুন বসানো কিডনিটাও দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করল। চিকিৎসকেরা দেখলেন, কিডনিটা যদি ওই তরুণের শরীরে রেখে দেওয়া হয়, তবে সেটি তো পুরোপুরি নষ্ট হবেই, উল্টো তরুণের জীবনের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই বাধ্য হয়ে মাত্র ১৪ দিনের মাথায় চিকিৎসকেরা আবার অপারেশন করে কিডনিটি তাঁর শরীর থেকে বের করে আনেন। তরুণকে আবারও ডায়ালাইসিস চিকিৎসায় ফিরে যেতে হয়।
সাধারণত শরীর থেকে বের করে আনা এমন কিডনি চিকিৎসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা খেয়াল করলেন, কিডনিটির যে ক্ষতি হচ্ছে, তার কারণ কিডনি নিজে নয়; বরং তরুণের শরীরের ওই বিশেষ রোগটি। কিডনিটি তখনো ভেতরে ভেতরে বেশ সতেজ। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এই কিডনি যদি এমন কারও শরীরে বসানো যায়, যাঁর ওই রোগটি নেই, তবে এটি হয়তো আবার ঠিকঠাক কাজ করতে শুরু করবে!
যেমন ভাবা, তেমন কাজ। চিকিৎসকেরা দ্রুত ৬৭ বছর বয়সী আরেকজন রোগীকে খুঁজে বের করলেন। তাঁরও জরুরি ভিত্তিতে একটি কিডনি দরকার ছিল। তাঁরা ওই তরুণের শরীর থেকে বের করা কিডনিটি এই বয়স্ক মানুষের শরীরে বসিয়ে দিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন শরীরে যাওয়ার পর কিডনিটি আবার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল এবং ম্যাজিকের মতো কাজ করতে শুরু করল! তরুণের শরীরের ওই ক্ষতিকর রোগটি না থাকায় বয়স্ক মানুষটির শরীরে কিডনিটি দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছিল।
শুধু কিডনি নয়, হৃৎপিণ্ড বা যকৃতের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ধরো, একজন রোগীর লিভার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁকে বাঁচানোর জন্য আরেকজনের সুস্থ লিভার তাঁর শরীরে বসানো হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ব্রেন স্ট্রোক বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার কারণে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক দিনের মধ্যেই ওই রোগী মারা গেলেন।
তখন তাঁর শরীরে বসানো নতুন লিভারটি যদি পুরোপুরি সুস্থ ও সতেজ থাকে, তবে চিকিৎসকেরা দ্রুত সেটি বের করে তৃতীয় কোনো অসুস্থ রোগীর শরীরে বসিয়ে তাঁর জীবন বাঁচাতে পারেন। তবে রোগীর মৃত্যুর পর অঙ্গটি শরীরের ভেতরে নষ্ট হওয়ার আগেই খুব দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তবে আগে যেমনটা বলেছি, কাজটা অত্যন্ত কঠিন। প্রশ্ন হলো, কেন কঠিন? এর পেছনে বিজ্ঞানের বেশ কিছু কঠিন ও বড় ধরনের বাধা আছে। প্রথমত, সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের জটিলতা। একটি অঙ্গ যখন প্রথমবার শরীর থেকে বের করা হয়, তখন এর সঙ্গে যুক্ত রক্তনালিগুলো কিছুটা কেটে ছোট করতে হয়। দ্বিতীয়বার বের করতে গেলে সেগুলো আরও ছোট হয়ে যায়। ফলে তৃতীয় মানুষের শরীরে ওই ছোট রক্তনালিগুলো নিখুঁতভাবে জোড়া দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। আমাদের শরীর বাইরের যেকোনো জিনিসকে সহজে মেনে নিতে চায় না, তাকে আক্রমণ করে বসে। একটি অঙ্গ যখন তিনজন ভিন্ন মানুষের শরীরে ঘোরে, তখন তাকে তিনটি আলাদা ইমিউন সিস্টেমের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। ফলে তৃতীয় ব্যক্তির শরীর অঙ্গটিকে প্রত্যাখ্যান করার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, সময়ের অভাব। একে বলা হয় ইশকেমিয়া টাইম। শরীরের বাইরে রক্ত চলাচল ছাড়া একটি অঙ্গ খুব বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না। অঙ্গটিকে বরফের বাক্সে ভরে এক অপারেশন থিয়েটার থেকে আরেকটিতে নিতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে শেষ করতে হয়। একটু দেরি হলেই অঙ্গটির টিস্যু মরে যায়।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন এমনিতেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিশাল অর্জন। তার ওপর একই অঙ্গ দুবার প্রতিস্থাপন করাটা যেন কল্পবিজ্ঞানের গল্পকেও হার মানায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এভাবেই প্রতিনিয়ত অসাধ্য সাধন করে চলেছে এবং মানুষকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে!
সূত্র: আমেরিকান জার্নাল অব ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ

No comments:
Post a Comment