অটোগ্রাফ শিকার: একটি সইয়েই হাজার পাউন্ডের ব্যবসা - অজানা ১০১
,

ব্রেকিং

Post Top Ad

PropellerAdsPropellerAds

Wednesday, March 25, 2026

অটোগ্রাফ শিকার: একটি সইয়েই হাজার পাউন্ডের ব্যবসা


স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড়। হাতে জার্সি, ছবি, কার্ড। চোখে প্রত্যাশার ঝিলিক। প্রিয় তারকা বেরিয়ে আসামাত্র শুরু হয় কাড়াকাড়ি। একটা সই। শুধু একটা সই।

ডিজিটাল যুগে অটোগ্রাফ সংগ্রহের এই নেশা সেকেলে হয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। আসলে ঘটনা উল্টো। ফুটবলের দুনিয়ায় ‘অটোগ্রাফ শিকারিরা’ এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। তবে সবাই ভক্তির টানে আসেন না। একদল আসেন ব্যবসার হিসাব মাথায় নিয়ে।

বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, অটোগ্রাফ সংগ্রাহকদের মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একদল নিবেদিতপ্রাণ ভক্ত, যাঁরা প্রিয় তারকার একটি সই অমূল্য স্মৃতি হিসেবে আগলে রাখতে চান। অন্যদল পেশাদার ব্যবসায়ী—অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে অনলাইনে চড়া দামে বিক্রিই যাঁদের পেশা।

এই দুনিয়ার দুই পিঠ দেখলে বোঝা যায়, সই মাঝে মাঝে কতটা জটিল হয়ে উঠতে পারে।

গার্দিওলার ধমক, আরতেতার অস্বস্তি

অনুশীলন মাঠের বাইরে, ট্রাফিক সিগন্যালে, পেট্রলপাম্পে, হোটেলের লবিতে—এমনকি খেলোয়াড়ের বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যান অটোগ্রাফ সংগ্রাহকেরা। কখনো এই উপস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও অনেক সময় তা ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ হয়ে দাঁড়ায়।

কিছুদিন আগে এক ম্যাচের পর আর্সেনাল কোচ মিকেল আরতেতা তাঁর গাড়ির কাছে আসা এক ব্যক্তিকে অটোগ্রাফ দিতে অস্বীকৃতি জানান। মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়। আরতেতার যুক্তি, সে মুহূর্তে তাঁর নিজেকে ‘অরক্ষিত’ মনে হয়েছিল। তাঁর দাবি, কিছু ভক্ত ‘সঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে’ অটোগ্রাফ নিতে আসেন না।

আর্সেনাল কোচ মিকেল আরতেতা

গত বছর ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলাও একই বিড়ম্বনায় পড়েন। বাড়ির কাছে পার্কিং লটে একদল অটোগ্রাফ সংগ্রাহককে দেখে মেজাজ হারান এই স্প্যানিশ কোচ। সরাসরি ধমক দিয়ে বলেন, ‘আর কখনো আসবে না—আমি তোমাদের মুখ চিনে রেখেছি। সত্যি করে বলো তো, এটাই কি তোমাদের জীবনের লক্ষ্য? তোমাদের স্বপ্নগুলো আসলে কী?’

পেশাদার অটোগ্রাফ শিকারিরা অভিজ্ঞ ও কৌশলী। তাঁরা খেলোয়াড়দের কাছে হাজির হন জার্সি ও ছবির সুসজ্জিত সব প্যাকেট নিয়ে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যত বেশি সম্ভব সই নেন। বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড়দের স্মারক পণ্যের বাজার বছরে কয়েক শ কোটি পাউন্ডের। বোঝাই যাচ্ছে, এই পেশার আয় মোটেও কম নয়।

পরিস্থিতি সামলাতে ক্লাবগুলোকেও নামতে হচ্ছে মাঠে। অনুশীলন মাঠের বাইরে পেশাদার সংগ্রাহকদের নিষিদ্ধ করা, কাছের পেট্রলপাম্পে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, এমনকি খেলোয়াড়দের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে আলাদা লোক পাঠানো—সব ব্যবস্থাই নিতে হচ্ছে।

২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার ম্যাসন মাউন্টের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। দেখা যায়, টানা কয়েক দিন বাড়ি পর্যন্ত পিছু নেওয়া অটোগ্রাফ শিকারিদের তিনি নিরুৎসাহিত করছেন। ইউনাইটেড ডিফেন্ডার নুসাইর মাজরাউইকেও চলতি মাসের শুরুতে একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। অনুশীলনের পর গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ানো এক সংগ্রাহকের জার্সিগুলোতে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও দায়সারাভাবে সই করে দেন।

ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা

‘এরা আসল ভক্তদের আনন্দ মাটি করে দিচ্ছে’

ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের হয়ে প্রিমিয়ার লিগজয়ী সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা এই বিষয়ে সত্যিই বীতশ্রদ্ধ। খেলোয়াড় হিসেবে এবং এখন বিশ্লেষক হিসেবেও আমি বহুবার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। তারা বিবিসির স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকে একসঙ্গে ১২টি জার্সি সই করতে বলে।’

সাটন যোগ করেন, ‘সই দেবেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একজন খেলোয়াড় বা কোচের আছে। কিন্তু আমরা “না” বললেই তারা অপমানজনক কথা বলে এবং ইন্টারনেটে আজেবাজে মন্তব্য করে। এরা আসলে বাচ্চাদের এবং আসল ভক্তদের আনন্দ মাটি করে দিচ্ছে।’

২০০৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে ৪০ ম্যাচ খেলা সাবেক ডিফেন্ডার ফিল জাগিয়েলকার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, ‘সমস্যা হয় তাদের নিয়ে, যাদের আপনি প্রায় সব জায়গাতেই দেখতে পান। এরা কখনো নিজেদের বাচ্চাদের পাঠায়, কখনো বন্ধুদের নিয়ে আসে—বেশি সই নেওয়ার কৌশল হিসেবে।’

এভারটনে থাকার সময়ের একটি ঘটনার কথা মনে করলেন জাগিয়েলকা। ‘এক লোক আমাকে একই রকম ২০টি কার্ড সই করতে দিয়েছিল। হয় একটিতেও সই করবেন না, অথবা সই করতে করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। কারণ আপনি জানেন, এগুলো সে পরে বিক্রি করে দেবে।’

তবে মাঝে মাঝে পেশাদার সংগ্রাহকের যুক্তিও অবাক করে দেয়। জাগিয়েলকা জানান, ‘সেই লোকটা সরাসরিই বলত যে সে এগুলো বিক্রি করবে। তার দাবি, এভাবে টাকা জমিয়েই সে লন্ডনে আমাদের খেলা দেখতে আসত।’

ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার ফিল জাগিয়েলকা

নারী ফুটবলে নতুন উদ্বেগ

নারী ফুটবলের ক্রমবিকাশের সঙ্গে দর্শকেরা তাঁদের প্রিয় তারকাদের আগের চেয়ে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। পুরুষদের প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় উইমেনস সুপার লিগে (ডব্লিউএসএল) খেলোয়াড়দের কাছে পৌঁছানো সহজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ ও মার্জিতও।

কিন্তু গত কয়েক মৌসুমে কিছু অভিজ্ঞতা ভিন্ন গল্প বলছে। ২০২২ সালে ইংল্যান্ডের ইউরোজয়ী দলের সদস্য নিকিতা প্যারিস জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন সিটি লায়নেস ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যকার ম্যাচ ড্র হওয়ার পর কিছু দর্শক তাঁর কাছে অটোগ্রাফের আবদার করেন। অথচ ম্যাচ চলার সময় এই একই দর্শকেরা তাঁকে লক্ষ্য করে দুয়োধ্বনি দিয়েছিলেন।

আর্সেনাল, চেলসি ও ওয়াটফোর্ডের সাবেক ফরোয়ার্ড এবং ওয়েলসের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হেলেন ওয়ার্ড মনে করেন, কিছু ভক্তের মধ্যে এখন একধরনের ‘অধিকারবোধ’ কাজ করে। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা মনে করেন, টিকিট কেটেছেন বলে ম্যাচের আগে বা পরে খেলোয়াড়দের পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া তাঁদের পাওনা।’

হেলেন আরও বলেন, ‘আমরা সব সময় দর্শকদের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন এমন এক নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যা আগে কখনো দরকার হয়নি। আমাদের সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে, যাতে ছোট ছোট মেয়েরা হতাশ হয়ে এ কথা না ভাবে যে—আমার নায়কেরা আমার কথা ভাবেন না।’

জাল সই, আসল টাকা

বিখ্যাত তারকাদের সই করা পণ্য অনলাইনে উঠলে দাম হাজার পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু চড়া দামে কেনা এসব স্মারকের সব কটি যে আসল, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
প্রতারক চক্র ভুয়া অনলাইন শপ খুলে সাধারণ জার্সিতে নকল সই বসিয়ে দেয়। নিজেরা জাল করে, মাঝে মাঝে হস্তাক্ষর নকলে দক্ষ বিশেষজ্ঞও ভাড়া নেয়। যুক্তরাজ্যে অটোগ্রাফ যাচাইয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। পণ্যের সঙ্গে ‘নিশ্চয়তাপত্র’ দেওয়া হলেও সেই সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন থাকে।

ইংল্যান্ড কিংবদন্তি ওয়েইন রুনি

২০১৮ সালে এমনই এক জালিয়াতিতে এক ব্যক্তিকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় এক দশক ধরে নকল স্মারক পণ্য বিক্রি করে তিনি ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি হাতিয়ে নিয়েছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সর্বোচ্চ গোলদাতা ওয়েইন রুনি নিজেই সেই জালিয়াতি ধরিয়ে দেন। ‘ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস’-এর কেনা একটি জার্সি পরীক্ষা করে রুনি নিশ্চিত করেন, সেটিতে থাকা তাঁর সই আসলে জাল।

সুতরাং সেই সইয়ের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে ভক্তির উত্তাপ, আবার থাকতে পারে প্রতারণার ঠান্ডা হিসাবও। আকাশচুম্বী দাম দিয়ে কোনো স্মারক কিনলেই যে তা আসল হবে—এই নিশ্চয়তা এখন আর কেউ দিতে পারে না।

একটা ছোট্ট সই হয়তো কারও জীবনের সেরা স্মৃতি, আবার কারও কাছে নিছকই পণ্য।

No comments:

Post a Comment