
<p> চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের শব্দের সঙ্গে একসময় মিশে যেত কয়েকজন তরুণের গানের সুর। সেই তরুণদেরই একজন শান শাহেদ। ২০০৭ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর মাথায় আসে একটা ব্যান্ড গড়ার ভাবনা। বন্ধুদের নিয়ে শুরু হয় পরিকল্পনা। পরের বছর জন্ম নিল ‘তীরন্দাজ’।</p><p> তখন শান শাহেদ ছিলেন ব্যান্ডটি ড্রামার। ভোকাল ছিলেন রাহাত। ড্রামে আরও ছিলেন জুনায়েদ, গিটারে মিথুন, বেজ গিটারে কপিল বড়ুয়া। কিবোর্ডে ও ভোকাল ছিলেন জিতু। ২০০৮ সালের শেষ দিকে শান শাহেদ হলেন ব্যান্ডের ভোকাল। রাহাত, জুনায়েদ, মিথুন ব্যান্ড ছেড়ে দেন ব্যক্তিগত কারণে।</p><p> এরপর ‘অন্ধকার ঘরে’ গানটি বদলে দেয় তীরন্দাজের গল্প। ২০১০-১১ সালের দিকে দেশে ফেসবুক জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তখনো সবার হাতে পৌঁছায়নি স্মার্টফোন। এর মধ্যেই ফোন থেকে ফোনে, ফেসবুক থেকে ফেসবুকে গানটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আর গানটিকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে একটি গল্প—গানটি লেখার পর লেখক আত্মহত্যা করেছেন। পরে অবশ্য জানা যায়, গল্পটির কোনো সত্যতা ছিল না। তত দিনে অবশ্য গানটি বিখ্যাত হয়ে গেছে।</p><p>‘নিকষ কালো এই আঁধারে, স্মৃতিরা সব খেলা করে, রয় শুধু নির্জনতা, নির্জনতায় আমি একা’—লাইনগুলো তখন অনেকের মুখে মুখে। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত পেপার রাইমের গানটি নতুন করে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয় তীরন্দাজ। নিজেদের মতো করে গানটিতে রক ফিউশন যোগ করে। চট্টগ্রামের সংগীতাঙ্গনে তীরন্দাজের পরিচিতি বাড়তে থাকে। মঞ্চেও বাড়তে থাকে ডাক। শান শাহেদের হিসাবে, ব্যান্ডটি এ পর্যন্ত ৫০০ বেশি মঞ্চ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছে। চট্টগ্রামের বাইরে সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠান করেছে ঢাকা ও সিলেটে। ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত চ্যানেল আইয়ের ব্যান্ড উৎসবে সাতবার পারফর্ম করেছে তারা।</p><p>শান শাহেদ বলেন, ১৮ বছরে তাঁদের নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। পেশাগত জীবন ও সংগীত—দুটো একসঙ্গে সামলে চলাও সহজ ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নেওয়াটাও সহজ ছিল না। গণমাধ্যমে উপস্থিতি, যোগাযোগ ও সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই চট্টগ্রাম থেকে কাজ করা ছিল বাড়তি চ্যালেঞ্জ। তবু চট্টগ্রাম থেকেই জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে তীরন্দাজ। ব্যান্ডটি এর মধ্যে বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (বামবা) সদস্যপদ পেয়েছে।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-09-23/bf5bp610/480463832_1177593420392722_7969579748828644959_n.jpg" /><figcaption>তীরন্দাজের সদস্যরা। ছবি : ব্যান্ডের ফেসবুক থেকে
</figcaption></figure><p>তীরন্দাজের মঞ্চজীবনের স্মরণীয় অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইয়ুব বাচ্চুর নাম। চট্টগ্রামে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার একই মঞ্চে গান করেছেন শান শাহেদ। এলআরবির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানেও আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন তিনি। ‘ঘুমন্ত শহর’ গানটি গাওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।<br>২০১৩ সালে নেওয়া হয় ‘রেড রক ফিয়েস্তা’র পরিকল্পনা। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নেয় প্রায় ৩৬টি ব্যান্ড। পরে ২০১৭ সালে নতুনভাবে আয়োজনটি শুরু হয়। ২০১৮ সালের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। কিন্তু অনুষ্ঠানটির প্রায় এক মাস আগে তাঁর মৃত্যু হয়।<br>এই দীর্ঘ যাত্রায় ব্যান্ডের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষকে হারিয়েছে তীরন্দাজ। ২০০৯ সালে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য কপিল বড়ুয়াকে হারায় তারা। ১২ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানে চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষা সফরের বাস দুর্ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ নিহত হন কপিল। ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট আসে আরেকটি দুঃসংবাদ। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তীরন্দাজের ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আলম চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর এতটাই ভেঙে পড়েছিল ব্যান্ডের সদস্যরা যে কিছু সময়ের জন্য অনুষ্ঠানও বন্ধ ছিল।</p><aside><a href="https://www.prothomalo.com/entertainment/song/g7467vlcvb">৮ ব্যান্ড ও ১২ শিল্পীর কণ্ঠে আইয়ুব বাচ্চুর ২০ গান, আসছে ‘উত্তরাধিকার’</a></aside><p>দীর্ঘ এই পথচলায় ব্যান্ডের সদস্যও বদলেছে। কেউ সংগীত ছেড়েছেন, কেউ পেশাগত ব্যস্ততায় সরে গেছেন। শিক্ষাজীবনে গড়ে ওঠা ব্যান্ডের সদস্যরা পেশাজীবনে প্রবেশের পর সংগীতের সঙ্গে অন্য দায়িত্বের সমন্বয় করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়েছেন। তবে এত সবের মধ্যেও নিজেদের মৌলিক গান তৈরির কাজ চলতে থাকে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘পাগলাটে গান’। গানটি লিখেছিলেন ব্যান্ডের সাবেক সদস্য বাহার। এটি ছিল তীরন্দাজের প্রথম গান। এভাবে নিজেদের মৌলিক গান নিয়েও ধীরে ধীরে আলাদা পরিচিতি তৈরি করে তারা। ব্যান্ডটির মোট ১৩টি গান রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি রেকর্ড করা হয়েছে। দুটি ‘কষ্ট’ ও ‘স্তব্ধ পৃথিবী’ নামের দুটি গান মিশ্র অ্যালবামে ছিল। নিজেদের অ্যালবাম ‘জাগো বাংলাদেশ’ নিয়েও কাজ করছে তীরন্দাজ।<br>চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে যে গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তা দেশের বিভিন্ন মঞ্চে পৌঁছে গেছে।</p><p><strong>বর্তমান লাইনআপ<br></strong>শান শাহেদ (ব্যান্ড নেতা ও ভোকাল), ওয়াসিফ আজমি, রাফি ইসলাম (বেজ গিটার), রূপন রয় ও শাহাদাত হোসেন (লিড গিটার), শাকিল খান (কিবোর্ডে)। ফয়সাল আহমেদ (সাউন্ড), জনি কুমার (ছবি ও ভিডিও) ও তানভীর নাঈম (ব্যবস্থাপক)।</p>

No comments:
Post a Comment