
মাটির ঘরের সামনের বারান্দায় বাবা-ছেলে পাশাপাশি বসে। ছেলের চোখে ক্লান্তি, মুখে অসহায়ত্ব। বাবার চাপা অভিমান। তিনি হাত বাড়িয়ে ছেলের হাতে গুঁজে দিচ্ছেন কিছু টাকা—হয়তো জমিজমা বিক্রি করে, হয়তো ধারদেনা করে জোগাড় করা শেষ সম্বল। ছেলে মাথা নিচু করে বসে—বিদেশ যাওয়ার বায়না তার। পেছনে দাঁড়িয়ে তরুণী স্ত্রী—চোখে বিস্ময় আর অজানা শঙ্কা। একসময় বাবা ছেলেকে বুকে টেনে নেন। অঝোরে কাঁদতে থাকেন।
‘তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা’—প্রবাসজীবনের বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত এই নাটকের সেই দৃশ্য আবার নতুন করে আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে দৃশ্যটির ভিডিও ও স্থিরচিত্র। অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যুর পরই নতুন করে সামনে এসেছে এই আবেগঘন মুহূর্তটি। প্রযোজনা সংস্থা ফাহিম মিউজিকও ভিডিওটি নতুন করে শেয়ার করেছে।
গত ১৮ মার্চ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনেকের মতে, বাংলা নাটকের শুধু একটি দৃশ্য নয়, বরং জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বিদেশযাত্রার আগে এমন বিদায়ের মুহূর্ত এ দেশের অসংখ্য পরিবারের চেনা অভিজ্ঞতা। সেই বাস্তবতাকেই অনবদ্য অভিনয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনজন শিল্পী—ইনামুল হক, শামস সুমন ও হোমায়রা হিমু।
আজ সেই দৃশ্যের তিন মুখই আর নেই। সময় তাঁদের আলাদা আলাদা পথে নিয়ে গেছে—কেউ গেছেন পরিণত বয়সে, কেউ অপূর্ণতা নিয়ে, কেউ অভিমান বুকে নিয়ে। কিন্তু দর্শকের কাছে তাঁরা এখনো একই ফ্রেমে—একটি পরিবার, একটি বিদায়ের মুহূর্তে।
তিন শিল্পী, তিনটি ভিন্ন যাত্রাপথ
নাটকের পিতার চরিত্রে অভিনয় করেন ইনামুল হক। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন দেশের অভিনয়জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। শিক্ষকতা ও নাট্যচর্চা—দুই ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন উজ্জ্বল অবদান। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
ছেলের চরিত্রে ছিলেন শামস সুমন। নব্বইয়ের দশকে যিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। তবে জীবনের শেষ সময়ে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার আক্ষেপ ছিল তাঁর। গত ১৭ মার্চ তিনি মারা যান।
আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন হোমায়রা হিমু। দুই দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য নাটকে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু শেষের দিকে কাজের অনিয়মিততা তাঁকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়। অনেকটা একা হয়ে পড়েন। ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একটি দৃশ্য, এক নির্মম বাস্তবতা
নাটকের সেই মুহূর্তে হয়তো কারও ভাবনায় আসেনি, কাছাকাছি সময়ে তিনজন শিল্পীই আর থাকবেন না! গড় আয়ুর বিবেচনায় একজন বিদায় নেবেন পরিণত বয়সে, একজন অপূর্ণতা নিয়ে, আরেকজন অভিমান বুকে নিয়ে। তবু দর্শকের কাছে তাঁদের শেষ পরিচয় হয়ে আছে সেই এক দৃশ্য—একটি পরিবারের ভেতরের কান্না, ভালোবাসা আর বিচ্ছেদের গল্প। ছবিটি যখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তা শুধু নস্টালজিয়া নয়—সময়কে মনে করিয়ে দেওয়ার এক নির্মম দলিলও বটে। একসময় শিল্পীরা চলে যান, থেকে যায় তাঁদের কাজ। আর সেই কাজের ভেতরেই তাঁরা বেঁচে থাকেন—দর্শকের স্মৃতিতে, অনুভবে।

No comments:
Post a Comment